
সত্তর দশকে নোয়াখালীর দক্ষিনে মেঘনার মোহনা ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে জেগে উঠে বয়ার চর, নাঙ্গলীয়া, চরলক্ষী, চর উড়িয়া সহ বিশাল চরাঞ্চল। স্বাভাবিক কারনে ভূমিহীনরা সে খাস জমিতে বসতি স্থাপন করতে চায়। বনবিভাগ চর জাগার পর থেকে সৃজন করে নিবিড় বনাঞ্চল। এ সময় থেকে ভূমিহীনদের সাথে বন বিভাগের সংঘাত শুরু হয়। এক পর্যায়ে ভূমিহীনরা সংঘবদ্ধ হয়ে বন উজাড় করে বসতি স্থাপন করতে থাকে। বয়ার চর থেকে উচ্ছেদ হয়ে যায় বন কর্মীরা। বন বিভাগ সে সময় অভিযোগ করেছিলো, প্রশাসন তাদেরকে কোনো সহযোগীতা করেনি। এ ছাড়া হাতিয়া ও নোয়াখালী সদরের সীমানা নির্ধারনের জটিলতা দেখা দেয়ায় সে এলাকায় প্রশাসন ছিলো নিস্কৃয়। সে থেকে ধীরে ধীরে সমগ্র চরাঞ্চল মূলত: পাঁচ বনদস্যুর হাতে জিম্মি হয়ে যায়। এরা হোলো নব্যাচোরা, বশার মাঝি, সোলেমান কমান্ডার, সফি বাতাইন্যা ও জাহাঙ্গীর কমান্ডার। নানান মহলের আশ্রয় প্রশ্রয় পেয়ে এরা এক একজন দুর্ধর্ষ দস্যু হয়ে উঠে। দীর্ঘ দিন ধরে নারী নির্যাতন সহ এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও অভিযোগ রয়েছে এদের ধরার জন্য প্রশাসন থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। রাজনৈতিক দল গুলোর সাথে এদের ছিলো দহরম মহরম। এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, বনদস্যু নিধনের নামে মানুষ খুন করার অধিকার জনতাকে কে দিলো? কোন মহলের ইঙ্গিতে জনতা খুনের নেশায় মেতে উঠলো? সবাই চায় গত কয়বছর ধরে চরাঞ্চলে যে দুর্ধর্ষ বাহিনি গুলো গজিয়ে উঠেছে ওদেরকে ধরে বিচার করা হোক। এরা মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধি। কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি দেবে কে। এর জন্য আইন আদালত আছে। আইনের বিধান আছে। আইনের কোনো ফাঁকফোঁকর থাকলে তা সংশোধন করার আইন সভা জাতীয় সংসদ আছে। সংসদ সদস্যরা বসে আইন তৈরী করবেন। দেশের কাঠামো ঠিক করবেন। গম ভাগাভাগির জন্য তাদেরকে জনগন সংসদ ভবনে পাঠায় নাই।
ইতিমধ্যে সচেতন মহল এই হত্যাকন্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। গণহারে এ নরহত্যা সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বলে অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন তাহলে এই মানুষগুলো কি পরিস্থিতির শিকার হোলো?
দেশের সাংবিধানিক আইনে রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা। যতবড় নৃশংস খুনি অপরাধি হোক, মানুষ হিসাবে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে, রাষ্ট্রের কাছে তার বিচার চাওয়ার ও পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন খুনি দন্ডযোগ্য আসামীকে বিনা বিচারে খুন করা দন্ডযোগ্য আর একটি খুনেরই নামান্তর। এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে যারা জড়িত আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান অপরাধি। ‘ইন্টারন্যাশনাল কাভিনান্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস্’(ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়াবহধহঃ ড়হ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং ) এর আর্টিকেল-৬ এ উল্লেখ আছে যে, প্রত্যেকের বাঁচার অধিকার আছে এবং সেই অধিকার আইনের দ্বারা সংরতি। অধিকিন্তু কেউ তার বেঁচে থাকার অধিকার থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হবেন না(সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষনা, ১৯৪৮-এর আর্টিকেল-৩)। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ১৯৮৯/৬৫ রেজুলেশন অনুসারে ‘বেআইনি ও অন্যায় হত্যা এবং আকষ্মিক হত্যার কার্যকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সরকারের দায় দায়িত্ব সুনিশ্চিত হয়’। এ বিষয়ে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষনার অর্টিকেল-৫ এ ব্যাক্তির মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অমর্যাদাকর ব্যবহার বা নির্যাতন করা যাবেনা’। উক্ত চুক্তির ধারা-২ এর ৩-(ক) উপধারায় বলা হয়েছে ‘যদি কোনো চুক্তিতে বর্নিত অধিকার এবং স্বাধিনতা সমূহ লঙ্ঘিত হয়, তবে উহার প্রয়োজনীয় প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে, যদিও উক্ত লঙ্ঘন সরকারী কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির দারা সংগঠিত হয়’। বাংলাদেশের সকল নাগরিকের অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কেউ চলমান আইনের ঊর্ধ্বে নয়।নোয়াখালীর চরাঞ্চলে যে গণহত্যার উৎসব হয়ে গেলো তা সুস্পষ্ট চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। রাষ্ট্রিয় ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারি অপরাধিদের বিচারের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। দেশের জনগণের এ ঘটনার সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।